
এস,কে সুজয় নড়াইল:নড়াইলে মধুমতী নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে। ৩ টি গ্রামের মানুষ ও ৬৯টি পরিবারের বসতভিটা চলতি বর্ষায় মধুমতী নদীতে বিলীন হয়েছে । ভাঙনের মুখে রয়েছে অন্তত ১৫০ টি পরিবার। একের পর এক নদীতে যাচ্ছে ফসলি জমি, গাছপালা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাকা সড়ক, মসজিদসহ নানা সামাজিক স্থাপনা। এ পরিস্থিতিতে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বিলীন হচ্ছে জনপদ।
এ অবস্থা নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের আমডাঙ্গা, আস্তাইল ও চরআড়িয়ারা গ্রামের। ঐতিহ্যবাহী জনপদ ছিল ওই তিনটি গ্রাম। গত তিন দশকে ওই তিন গ্রামের ৯৫ ভাগ পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এর অধিকাংশ পরিবার ৩-৭ বার ভাঙনের কবলে পড়েছে। অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বসতি গড়েছেন। অসচ্ছলতার কারণে যাঁরা শহরে বা অন্যত্র যেতে পারেননি, তাঁরা একবার এ পাড়ে, আরেকবার অন্যপাড়ে বসতি গড়ছেন। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছেন মধুমতীর সঙ্গে। কিন্তু এ ভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমডাঙ্গা গ্রাম নদীতে ভেঙে তিনটি জনপদের সৃষ্টি হয়েছে। নদীর এ পাড়ে পিছিয়ে বসতি গড়েছেন অনেকে। বেশিরভাগ পরিবার নদীর অপরপাড়ে বসতবাড়ি করেছেন। সে অংশের নাম এখন পারআমডাঙ্গা। আরেকাংশ চারপাশ দিয়ে নদীবেষ্টিত আস্তাইল-আমডাঙ্গায় বসতি গড়েছেন। বর্তমানে পারআমডাঙ্গা ও আস্তাইল-আমডাঙ্গা অংশে ভাঙন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আস্তাইল গ্রামের অধিকাংশ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে অপরপাড়ে বসতি গড়েছেন। এ অংশের নাম হয়েছে পারআস্তাইল।
পারআস্তাইলে এখন ভাঙন অব্যাহত আছে। চরআড়িয়ারা গ্রামের অধিকাংশ পরিবার পিছিয়ে আমডাঙ্গা এলাকায় বসতবাড়ি করেছেন। আবার অনেকেই অপারপাড়ে গিয়ে বসবাস করছেন। এ গ্রামের অপারপাড়ে এখন ভাঙছে। হুমকির মুখে রয়েছে অন্তত দেড় শটি পরিবারের বসতবাড়ি, আস্তাইল গুচ্ছগ্রাম এবং আস্তাইল, আস্তাইল-আমডাঙ্গা ও পারআমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
স্থানীয় লোকজন জানান, চরআড়িয়ারা ও আমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং চরআড়িয়ারা মাদ্রাসা তিনবার, আমডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় দুইবার, আস্তাইল ও আস্তাইল-আমডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একবার নদীতে ভেঙেছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এ বর্ষায় নদীতে বিলীন হয়েছে আস্তাইল-আমডাঙ্গা গ্রামের মান্নান সরদার, লুৎফার সরদার, দৌলত আলী, লুৎফার আলী, ছুরোত আলী, আরবান সরদার, আকিদুল শেখ, আমির মোল্লা, টুনু শেখ, আরিফ ঠাকুর, তারিফ ঠাকুর, ছোরাপ সরদার, আকবর সরদার, জাকির সরদার, কাদের সরদার, মমিনুল মোল্লা, আমিনুর মোল্লা, হাদিয়ার মোল্লা ও কালু সরদারের বসতভিটা।
এ ছাড়া গত দুই মাসে আস্তাইল গ্রামের আজগর ফকির, কদম ফকির, রওশাদ সরদার, রিজু সরদার, রাঙ্গু শেখ, ইমরান শেখ, উজির মিয়া, জহুর শেখ, জাহিদুর শেখ ও ফুলমিয়া শেখ এবং চরআড়িয়ারা গ্রামের বাদশা শেখ, মঞ্জু শেখ, আলোয়ার শেখ ও বাচ্চু শেখের বাড়ি গ্রাস করেছে মধুমতী। আস্তাইল গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সিরাজ ফকির বলেন, ‘সাতবার মধুমতীতে গেছে আমার বসতভিটা। এখন আমি পথের ফকির।’ পারআমডাঙ্গা গ্রামের লুৎফার মোল্লা বলেন, পাঁচবার নদীতে গেছে বসতভিটা। অন্তত ১০ একর ফসলি জমি নদীতে। চলতি বর্ষায় পাঁচ একর ফসলি জমি নদীতে গেছে। এখন নিঃস্ব হয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য হাসান শেখ ও সার্জিদ মোল্লা জানান, ভাঙনরোধে গত তিন দশকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চলতি ভাঙনে কোনো ত্রাণও দেওয়া হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহেনওয়াজ তালুকদার বলেন,‘ওই জায়গায় বড় এলাকা ভাঙনের শিকার। এখানে ডিপিপি তৈরি করে বড় প্রকল্প নিতে হবে। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন।